ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশন (ইউএফএস) নামের একটি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত চারটি মিউচুয়াল ফান্ডের ১৫৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। মিউচুয়াল ফান্ডটি জাল ব্যাংকের প্রতিবেদন এবং ভুয়া এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রেট) দেখিয়ে এ অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সূত্রে জানা গেছে।
ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক পর্যায়ে বিএসইসি তদন্ত করে। ওই তদন্তে বেশ কিছু অনিয়ম পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হয় তাহলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও শুনানি করতে হবে। তাই পরবর্তীতে একটা চূড়ান্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। সেটা শেষ হলে একটি প্রতিবেদন কমিশনে জমা হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইনের ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হবে। পরে যে সকল সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন হবে তার বিপরীতে কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা নিবে। যেখানে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সেখানে কমিশন কোনো ছাড় দিবে না।
অর্থ ফেরতের বিষয়ে তিনি বলেন, ফান্ডের সবকিছু বিধিমালা অনুযায়ী হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের যদি ক্ষতি হয় তার বিপরীতে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে সে বিষয়ে বলা আছে। সে ক্ষেত্রে ট্রাস্ট ডিড অনেক বড় বিষয়, বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ কিভাবে হবে সেটা ট্রাস্ট ডিড দেখে কমিশন ব্যবস্থা নিবে। সে ক্ষেত্রে বিনা কারীদের বিনিয়োগ যেন না হারায় তারা যেন ফেরত পায় সে বিষয়ে চেষ্টা করবে কমিশন।
এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিদ্ধান্তের বিষয়টি তদন্তের উপর নির্ভর করে। এই মুহূর্তে তদন্ত কমিটি প্রাথমিকভাবে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছে কিনা সেটা আমার জানা নেই।
তথ্য মতে, ইউএফএস একটি সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির অনুমতি নিয়ে এই কোম্পানি বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে। নিয়ম অনুসারে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে কোনো অনিয়ম হলে, ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ান প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে রিপোর্ট করতে হয়। কিন্তু ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ানের সামনেই এই জালিয়াতি করেছে ইউএফএস। ভুয়া সম্পদ দেখানো এবং অস্তিত্বহীন ব্যাংক ব্যালেন্স দেখিয়েছে। এসব বিষয়ে অভিযোগ এলে সদ্য বিদায়ী বছরের ১৯ জুন তদন্ত কমিটি গঠন করে কমিশন। ৪ মাস ১০ দিন পর গত ৩০ অক্টোবর প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেয় কমিটি।
এদিকে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ হামজা আলমগীর গত ১৩ অক্টোবর এই টাকা নিয়ে দুবাই পাড়ি জমিয়েছেন বলে তদন্তে জানানো হয়েছে। তাই কোম্পানিটির সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশে অর্থ পাচার করছে। এক্ষেত্রে ৪টি মিউচুয়াল ফান্ড থেকে ১৫৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য মিলেছে। আবার তদন্তকালে পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে আরও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। শেয়ার বিক্রির এই তথ্য যোগ হলে আত্মসাতের অর্থের অঙ্ক আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে কমিশন ধারণা করছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এ চক্র।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ৫টি মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনা করছে ইউএফএস। এসব তহবিলের আকার ৪৪০ কোটি টাকা। এই ফান্ডগুলোর ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ান (গ্যারান্টি দেওয়া প্রতিষ্ঠান) হিসাবে রয়েছে সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।